
স্মৃতির অলিন্দে
ভেসে ওঠা এক সোনা মুখ
নীহার বানু
—————————————————-
আজ থেকে ৫০ বছর আগের কথা!
সেদিন রাজশাহী মহানগরীতে সংঘটিত হয়েছিল এক অরাজনৈতিক হত্যাকান্ড। সময়টা ছিল ১৯৭৬ সালের ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার শীতের এক গোধূলি বেলা।
সহপাঠী বাবুর একতরফা প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় সেদিন নৃশংসভাবে ভাবে খুন হতে হয়েছিল নীহার বানুকে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্রী সুন্দরী নীহার বানুকে ওরা নির্মমভাবে খুন করার পর লাশটি স্টিলের বড় ট্রাঙ্কের ভিতর ঢুকিয়ে শহরের হেতেম খাঁ মহল্লার লিচু বাগান এলাকায় সহপাঠী বাবুর মেস বাড়ির টিউবওয়েলের পাশে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে রেখেছিল।
জন্ম ৯ জানুয়ারি ১৯৫৩ সালে দিনাজপুরের চিরির বন্দর উপজেলার বাসুদেবপুর গ্রামের এক শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে নীহার ছিলেন দ্বিতীয়।
পিতা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ নজিবুর রহমান। ছিলেন সমবায় রেজিস্ট্রার।
৭১ এর ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। তাঁর অপরাধ ছিল তিনি একটি মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
নীহার বানু রংপুরের রবার্টসনগঞ্জ হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তির মাধ্যমে তাঁর ছাত্র জীবন শুরু করেন।
পিতার বদলির চাকরির কারণে নীহার পর্যায়ক্রমে দিনাজপুর সরকারি গার্লস হাই স্কুল, নওগাঁ সরকারি গার্লস হাই স্কুল ও পাবনা সরকারি গার্লস হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন।
১৯৬৮ সালে এসএসসি পাসের পর তাঁর পিতা রাজশাহী বদলি হলে নীহার রাজশাহী মহিলা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে কৃতিত্বের সাথে দ্বিতীয় বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেকেন্ড ক্লাস পেয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
সুন্দর সুকুমার বৃত্তি ও নির্মল হৃদয়ের শিল্পীমনা মেয়ে ছিলেন নীহার বানু। তাঁর শখ ছিল ছবি তোলা, গান শোনা, বই পড়া ও কবিতা আবৃত্তির।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন রাজশাহী বেতারে কয়েকবার কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন তিনি।
মৃত্যুর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান শেষ বর্ষের ছাত্রী নীহার বানু এমএ ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
কিন্তু ঘাতকদের নৃশংসতায় তিনি আর সেই সুযোগ পাননি। মাত্র তেইশেই নিভে যায় এক অপার সম্ভাবনাময়ী প্রতিভার প্রদীপ।
সেদিন বড় ধরনের এই খুনের ঘটনায় গোটা দেশজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। চলে আলোচনা-পুলিশ-আসামি, ফাঁসি। এরপর শুধুই স্মৃতি।
ধূসর বিবর্ণ। অতঃপর বিস্মৃতি! ঘটনা আর মনেও থাকে না কারও। চায়ের কাপের সেই ঝড় থামে একসময়। তবে দু একটি অশ্রু ভেজা চোখ তখনও জেগে ছিল।
আজ ৫০ বছর পর আবারও ফিরে এসেছে সেইসব ঝড়, রক্ত, শকুন আর কাপালিক ছুরির বিভৎসতার স্মৃতি।
বিচার? হ্যাঁ, বিচার যা হয়েছিল তা ছিল প্রহসনের। মূল খুনি বাবু আজও থেকে গেল অধরাই। বাকি কারো হয়েছে বেকসুর খালাস। কেউ ভোগ করেছে সাময়িক সাজা।
দিনটি ছিল ১৯৭৬ সালের ২৭ জানুয়ারির আজকের মতোই মঙ্গলবার শীতের এক গোধূলি বেলা। শ্রদ্ধাঞ্জলি।