• শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
নাসির উদ্দীন বিশ^াসের ৪র্থ মৃত্যু আজ দৌলতপুরে যাত্রীবাহী বাস ও কলাবোঝাই নছিমনের মুখোমুখি সংঘর্ষে জাহান আলী নামে এক ব্যক্তি নিহত অন্তত ২০ জন আহত দৌলতপুর পিতার মৃত্যুর খবর শুনে বাড়িতে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় ছেলের মৃত্যু দৌলতপুরের পদ্মা নদীতে ডুবে শিশুর মৃত্যু দৌলতপুর সীমান্তে বিজিবির অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় অবৈধ চোরাচালানী মালামাল উদ্ধার দৌলতপুরে অস্ত্র-ককটেল সহ যুবককে আটক, গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ দৌলতপুর সীমান্তে বিজিবির পৃথক অভিযানে ৬ লক্ষাধিক টাকার ভারতীয় মাদকদ্রব্য উদ্ধার দৌলতপুরে কথিত পীর মো. আব্দুর রহমান ওরফে শ্রী শামীম জাহাঙ্গীর কালান্দার দাফন করা মরদেহ কবর থেকে তুলে দরবারে প্রতিস্থাপন //পরে বিষয়টি জেলা প্রসাশকের নির্দেশে বিকেল ৪ টার সময় লাশ যেখানে দাফন করা ছিল সেখানে আবার দাফন দৌলতপুর সীমান্তে বিজিবির পৃথক অভিযানে ১৮ লক্ষাধিক টাকার ভারতীয় মাদকদ্রব্য ও চোরাচালানি পণ্য উদ্ধার দৌলতপুর সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৬ লক্ষাধিক টাকার ভারতীয় মাদকদ্রব্য ও চোরাচালানি মালামাল উদ্ধার

কুষ্টিয়ার মেয়ে কন্ঠ শিল্পী নার্গিস পারভীন জন্ম ১৩ আগস্ট

Khandaker Jalal uddin
Update : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

কুষ্টিয়ার মেয়ে কন্ঠ শিল্পী নার্গিস পারভীন জন্ম ১৩ আগস্ট

সাত ও আটের দশকের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী নার্গিস পারভীন ১৯৪৭ সালের ১৩ আগস্ট কুষ্টিয়ায় জন্ম নেন, পিতা মাহতাব উদ্দিন ছিলেন আইনজীবী । তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং রাজশাহী ও ঢাকা বেতারে গান গেয়ে সংগীত জগতে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন নার্গিস পারভীন ১৯৪৭ সালের ১৩ আগস্ট কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মাহতাব উদ্দিন ছিলেন একজন আইনজীবী। পরিবারে গান-বাজনার চর্চা থাকায় ছোটবেলা থেকেই তিনি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
সংগীত জীবন ও জনপ্রিয়তা রাজশাহী বেতারে গান রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে তার পেশাদার সংগীত জীবনের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৪ সাল থেকে তিনি ঢাকা বেতারে নিয়মিত গান গাওয়া শুরু করেন। সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের অত্যন্ত জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ছিলেন তিনি। তার গাওয়া অনেক গান ও সুর আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে সমাদৃত।

নার্গিস পারভীন। ৭০ ও ৮০ দশকের বেতার ও টেলিভিশনের এক অনন্য জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ছিলেন নার্গিস পারভীন। অসংখ্য কালজয়ী গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি যে গানগুলো আজও শ্রোতার হৃদয়ে বেঁচে আছে। তাঁর জাদুমাখা সুরেলা কণ্ঠের মূর্ছনায় এক সময় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকত কোটি দর্শক-শ্রোতা।

বড় ভাই ও বাবা গান করতেন শখের বসে, তাই পরিবারে একটা সাংস্কৃতিক আবহ বিরাজ করত। সেই আবহে তিনিও ঝুঁকে পরেন গানের দিকে, মূলত বড় ভাই ও বাবার অনুপ্রেরণাতেই শৈশব থেকেই সংগীত চর্চার সঙ্গে বেড়ে ওঠেন নার্গিস পারভীন।

১৯৭২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাস করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই, রাজশাহী বেতার-এ গান করেছেন।

১৯৭২ সালের ৮ অক্টোবর বিয়ে করেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষককে। নার্গিস পারভীন বিসিআইসিতে উচ্চপদে চাকুরি করলেও সঙ্গীতই ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান সাধনা।

১৯৭৪ সাল থেকে ঢাকা বেতার-এ গান গাওয়া শুরু করেন নার্গিস পারভীন। কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁর উত্থান শুরু হয় ৭০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। পুরো ৮০ দশক জুড়ে বেতার ও টেলিভিশনে গাওয়া তাঁর গানগুলো জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করে। কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নার্গিস পারভীনও তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন সব ধরণের দর্শক-শ্রোতাদের কাছে।

বেতার-এ তাঁর গান শুনে প্রখ্যাত সুরকার আলম খান, নার্গিস পারভীনকে সুযোগ করে দেন চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার, আলম খান এর সুর ও সঙ্গীতে ‘কন্যাবদল’ চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে অভিষেক হয় নার্গিস পারভীন।

আবুল বাশার পরিচালিত ‘কন্যাবদল’ চলচ্চিত্রটি মুক্তিপায় ১৯৭৯ সালে। চলচ্চিত্রের প্রথম গানেই তিনি জনপ্রিয়তা পান, প্রশংসিত হন সূধীমহলে।

নার্গিস পারভীন অল্পসংখ্যক চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন। তিনি যেসব চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন তারমধ্যে- কন্যাবদল, ভালো মানুষ, প্রিন্সেস টিনা খান, শাস্তি, সমর্পণ, ভাগ্যবতি, উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও নার্গিস পারভীন, বেতার ও টেলিভিশনের বিভিন্ন বিজ্ঞাপন চিত্রের জিঙ্গেলেও কন্ঠ দিয়েছিলেন।

নার্গিস পারভীনের গাওয়া কিছু কালজয়ী জনপ্রিয় গান- ভালবাসা দিয়ে মোরে এত সুখ দিয়েছ…, চাই না আর কিছু চাই না…, আমার চোখে রাত্রি থাকুক…, ময়ুর মহলেও আমার মন বসবে না…, মনে আমার এ কোন ভাবনা…, যে আমার হৃদয় করলো চুরি…, চলো না কোথাও নিরিবিলি…, মাধবী রাতে সুনীল মায়া…, অমাবস্যা পূর্ণিমা কোনটা ভালো…, দুটি মন আর দুটি জীবন…, আমার এই আলতা পরা পা… প্রভৃতি।

সত্তর ও আশি দশকে তিনি ছিলেন বাংলা গানের অবিচ্ছেদ্য কণ্ঠে অনেকেই খুঁজে পেতেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ছায়া।

বাংলাদেশের সোনালী যুগের তিনি ছিলেন শেষ জাদু- কন্ঠগুলোর একটি। যাঁর কন্ঠে উপমহাদেশের কিংবদন্তী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ছায়া খুঁজে পেতেন ওই সময়ের সঙ্গীত প্রেমীরা। যদিও এই অদ্ভুত সাদৃশ্যের ব্যাপারটি অন্ধ অনুকরণের কোনো বিষয় ছিল না। যা ছিল নিতান্তই প্রকৃতিগত এবং ঈশ্বরপ্রদত্ত। যাঁর গান মানুষকে স্বপ্ন জাগাতো-ভালোবাসতে শেখাতো কখনো-সখনো ভোলাতো নিদারুণ কষ্ট।মাতাল করা কন্ঠের মাদকতায় মোহাবিষ্ট হতো এ দেশের লক্ষ কোটি দর্শকশ্রোতা।
অসাধারন গীতিকবিতায় শ্রুতিমধুর সুর আর গায়কীমদির বিহ্বলতায় তাঁরই গাওয়া গানগুলো পায় আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। অন্যদিকে তিনি হয়ে উঠলেন দিনে দিনে বাংলা মৌলিক গানের এক অপরিহার্য্য কন্ঠ সঙ্গীত শিল্পী।

বাংলাদেশের সঙ্গীতের অসংখ্য কাব্য সৌন্দর্যময় জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা,দেশের অন্যতম মেধাবি এবং শক্তিমান গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান’র লেখা এবং বাংলাদেশের সঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ, বরেণ্য সঙ্গীতজ্ঞ, সুরের বরপুত্র-খোন্দকার নুরুল আলম’র সুর-সঙ্গীতে বেশ কয়েকটি গান ওইসময় শিল্পী নার্গিস পারভীন-কে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

০১. যে আমার হৃদয় করলো চুরি
কথা-মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান সুর: খোন্দকার নুরুল আলম

০২. সবাই বলে-যত সর্বনাশের মন
কথা: মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান সুর: খোন্দকার নুরুল আলম

০৩. পোড়া চোখ কেনো তুই অন্ধ
কথা: মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান সুর: খোন্দকার নুরুল আলম

০৪. অন্তরে কাঁদন আমার চোখে
কথা: মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান সুর: খোন্দকার নুরুল আলম

-এমনই অসংখ্য কালজয়ী গানের শিল্পী নার্গিস পারভীন। যে গানগুলো ওই সময় রেডিও-টেলিভিশনে প্রতিনিয়ত বাজতো। দর্শকশ্রোতারাও মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে শুনতো তাঁর গান। আজও জাদু-মাখা সেই কন্ঠ যেন সুরে সুরে মুগ্ধতা ছড়িয়ে মাতিয়ে তোলে বাংলা মৌলিক গানের শুদ্ধ শ্রোতাদের হৃদয়-মন।

এই কুষ্টিয়ায় কেটেছে শিল্পীর শৈশব-কৈশোর। বাবা-ছিলেন পেশায় একজন নামকরা আইনজীবী। নার্গিস পারভীন’র বাবা এবং ভাই গান করতেন শখের বশে। মূলত তাদের অনুপ্রেরণায় শৈশব থেকেই সংগীত চর্চার সঙ্গে বেড়ে ওঠেন নার্গিস পারভীন। আড়ুয়াপাড়ায় গাছাপালা ঘেরা লাল ইটের দোতলা বাড়িটিতে ছিল সঙ্গীতের এক অন্যরকম আবহ। এছাড়া কুষ্টিয়ায় একদিকে লালন আর অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ এ যেনো সোনায় সোহাগায় কেটেছে নার্গিস পারভীন’র
সঙ্গীত জীবন।খুব অল্প সময়েই ছড়িয়ে পড়ে সঙ্গীত প্রতিভা নার্গিস পারভীন এর নাম।

ইংরেজি উনিশ’শ বাহাত্তর সাল। কথা দিয়েছিলেন দুজনই। ভালোবাসার ভেলায় চড়ে পথ চলবেন দুজন একসঙ্গে।
এমনই আত্মবিশ্বাসে একই সালের ৮ অক্টোবর ভালোবেসে বিয়ে করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষককে।

ইংরেজি উনিশ’শ চুয়াত্তর সাল। ঢাকা বেতারে গান গাওয়া শুরু করেন নার্গিস পারভীন। ঢাকা বেতারে এবং পরবর্তীতে টেলিভিশনে একের পর এক গান গেয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন নিজেকে। ওই সময়টাতে রেডিও- টেলিভিশনে গান গেয়ে দর্শকশ্রোতার মন জয় করে নিয়েছিলেন যে ক’জন গুণী কন্ঠশিল্পী তন্মধ্যে-নার্গিস পারভীন অন্যতম। বিশেষ করে বেতারে আধুনিক গানে এই শিল্পীর সতেজ কন্ঠের আওয়াজ শোনা যেতো সর্বত্র। শ্রোতারাও মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে শুনতো তাঁর গান।

বাংলাদেশ বেতারে শিল্পীর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে ‘কন্যা বদল’ ছায়াছবিতে শিল্পী নার্গিস পারভীন-কে চলচ্চিত্রে নেপথ্যে কন্ঠ দেয়ার সুযোগ করে দেন-দেশের প্রখ্যাত সুরস্রষ্টা আলম খান।

– ভালোবাসা দিয়ে মোরে এতো সুখ দিয়েছো
কথা : গাজী মাজহারুল আনোয়ার সুর-সঙ্গীত : আলম খান

যে গানের মধ্য দিয়ে তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরবর্তীতে ঢাকা বেতার-টেলিভিশন হয়ে চলচ্চিত্র সর্বত্রই নার্গিস পারভীন গান গেয়ে হয়েছেন সমাদৃত। সতন্ত্র গায়নশৈলীতে শিল্পী নার্গিস পারভীন’র গাওয়া গানগুলো ছিল যেমন বাণী প্রধান তেমনি সুরগুলোও ছিল বেশ ব্যতিক্রম।দিনে দিনে নার্গিস পারভীন হয়ে উঠলেন-বাংলা গানের এক আস্থাভাজন জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী।

পঁচিশটির মতো চলচ্চিত্রের গানে নেপথ্যে কন্ঠ দিয়েছেন স্বর্নকন্ঠী এ শিল্পী। নন্দিত এই কণ্ঠশিল্পী চলচ্চিত্রের গান গেয়েই পেয়েছেন অসামান্য খ্যাতি। নিভৃতচারী, বরেণ্য শিল্পী নার্গিস পারভীন গান গাওয়াটাকেই জীবনের ধ্যান ও জ্ঞান হিসেবে নিয়েছিলেন। তাইতো সোনালী সময়ের ওইসব গান যে কারো মনকে সহজেই নাড়া দিয়ে যায় এখনও। তাঁর মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠে কালজয়ী হয়েছে অনেক গান। এর মধ্যে-

– তোমাকে ভালবাসি সে আমার অহংকার
– পোড়া চোখ কেন তুই অন্ধ থাকিস না
– আমার চোখে রাত্রি থাকুক
– ময়ুর মহলেও আমার মন বসবে না
– মনে আমার এ কোন ভাবনা
– যে আমার হৃদয় করলো চুরি
– তোমার দেয়া ভালোবাসা
– চলো না কোথাও নিরিবিলি
– মাধবী রাতে সুনীল মায়া
– মিথ্যে সুখের গান গেয়ে
– কংলক আর বেঁচে রবে কতদিন
– এদেশ আমার সবুজে
– আমি তো কেবলই এক
– তোমাকে বিদায় দিয়ে শ্রাবনের
– অমাবস্যা পূর্ণিমা কোনটা ভালো
– পাখির কন্ঠে গান
– কাগজের ফুল নয় দু’চোখের ভূল নয়
– চাইনা কিছু চাইনা আমার আছে লক্ষী সোনা
– বড় বেশি দেরি হয়ে গেছে
– বুঝিনা তার নীরব মনের কিসে এমন বায়না

এছাড়াও শিল্পী নার্গিস পারভীন’র কয়েকটি দ্বৈত গান বেশ শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। তন্মধ্যে-

– বন বাতাসের ছন্দে দোলানো : প্রবাল চৌধুরী ও নার্গিস পারভীন
– সজনী প্রেম হলো বেদনা : সৈয়দ আব্দুল হাদী ও নার্গিস পারভীন
– দুটি মন আর দুটি জীবন : সুবীর নন্দী ও নার্গিস পারভীন
– এই পথ যদি হতো শান্ত নদী : প্রবাল চৌধুরী ও নার্গিস পারভীন

এই রকম অসংখ্য গানের শিল্পী নার্গিস পারভীন বাংলা মৌলিক গানকে পৌঁছে দিয়েছে অন্য এক উচ্চতায়। এছাড়া বেতার-টেলিভিশনের বিভিন্ন বিজ্ঞাপন চিত্রের জিঙ্গেলেও কন্ঠ দিয়েছিলেন গানের পাখি নার্গিস পারভীন। আর মায়াময় সেই সুরেলা কন্ঠ পৌঁছে যেত বাংলার ঘরে ঘরে।

সত্তর-আশি দশকে বাংলা গানের অপরিহার্য্য এই কন্ঠশিল্পী তখনও তুমুল জনপ্রিয়। এমনি এক সময় জীবনের প্রয়োজনে একমাত্র পুত্র সন্তানসহ স্বামীর সাথে বিদেশে পাড়ি জমান শিল্পী নার্গিস পারভীন। স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে গেলেও জীবনের সুর ও ছন্দের অন্ত্যমিল-এর ভাবনা শিল্পীকে করে তোলে বড় বেশি ব্যাকুল। জীবনের অংক মিলাতে গিয়ে শিল্পী যেন ভুলের পাহাড়ই গড়েছেন-এমনই ভাবনায় পেয়ে বসে শিল্পীকে খুব বেশি। যন্ত্রনাকাতর সব কথার সুরে যাঁর গানে থাকতো ছেয়ে আজ যেন তারই ছায়া পড়েছে শিল্পীর জীবনে।

অবশেষে কোনো একদিন এক পৃথিবী অভিমান নিয়ে সন্তানসহ ফিরে আসেন স্বদেশে। ফিরলেন সপ্তস্বরের মোহময় সুরের ভূবনে। সব ভূলে সঙ্গীতের মাঝেই সমর্পিত করলেন নিজেকে। সেই মায়াময় সুরেলা কন্ঠের জাদুতে ছুঁয়ে দিলেন শ্রোতাদের আবারও। সাত সুরে জীবনকে জড়ালেও শেষতক ছিঁড়েই গেলো স্বামীর সাথে সম্পর্কের বিনিসূতো। যে ছিল কাছে সে সন্তানও চলে গেলো বিদেশে। যেন ধরে রাখা গেলো না কাউকেই-কিছুতেই।

নব্বইয়ের দশক। বদলে যেতে থাকে বাংলা গানের ধারা। গানের এই হাওয়া বদলে খুবই ব্যথিত হন কালজয়ী শিল্পী নার্গিস পারভীন। কারণ এই গানের জন্যই তো জীবনের এতো ত্যাগ। এই গানই তো তাঁর প্রান। একে একে সব হারানোর বেদনা আর স্বপ্ন ভাঙ্গা মন নিয়ে চলতে থাকেন নার্গিস পারভীন। হাওয়ায় বদলে যাওয়া গান থেকেও ধীরে ধীরে সরে আসেন অভিমানি এশিল্পী।

দিন আসে রাত ফুরোয়। তবুও যেন নার্গিস পারভীন’র জীবনে আসে না নতুন ভোর। কেবলই অন্ধকার আর অন্ধকার। শিল্পীর জীবনে দেখা দেয় নতুন আরেক অধ্যায়। একাকি নিসঙ্গ জীবনে শরীরে ঠাঁই নিলো মরনব্যাধি ক্যানসার। শেষ জীবনের বোঝা যেন অনেকটাই ভার ছিল। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি যেন একেবারেই নিরব নিথর হয়ে রইলেন। সেই সময় শিল্পীর পাশে ছিলনা কেউ-ই। পুত্রসম একজনই শিল্পীর কাছে ছিলেন জীবনের শেষ দিনগুলোতে।
পুরো সঙ্গীত জীবনে যাঁর পরিচ্ছন্ন, মায়াময়, সতন্ত্র মধুঝরা কন্ঠে কালজয়ী হয়ে আছে অসংখ্য গান। শুধু গান দিয়েই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম মানুষের মনে সুরের মূর্চ্ছনায় যিনি ছুঁয়ে দিতে পারতেন-তেমনি একজন ক্ষণজন্মা প্রতিভাময়ী শিল্পী নার্গিস পারভীন। আহা! কী নিদারুণ শিল্পী জীবন।

ইংরেজি দু’হাজার সাত। এভাবেই ক্যানসারের সাথে লড়াই করতে করতে আসে পনের নভেম্বর। কুষ্টিয়ার নিজ বাসভবনে চিরদিনের জন্য সকলের দৃষ্টি সীমানার অন্তরালে হারিয়ে গেলেন সুরেলা কন্ঠী নার্গিস পারভীন।

জীবন যেমন সত্য-মৃত্যু তেমন শাশ্বত। তবুও বাংলা গানের ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা থাকবে অনন্তকাল। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর অনবদ্য সব সৃষ্টির মাঝে। নার্গিস পারভীন নামে আমাদের একজন কন্ঠশিল্পী ছিলেন –একথা জানেন না আজ এই প্রজন্মের অধিকাংশ শিল্পী-ই। তবুও আমরা গর্বিত-আমাদের দেশে জন্মেছিলেন নার্গিস পারভীন’র মতো গুণী শিল্পী। কিন্তু দুর্ভাগ্য জীবতাবস্থায় শিল্পী নার্গিস পারভীন পাননি তাঁর যোগ্য সন্মান।

এই প্রতিভাবান কণ্ঠশিল্পী তাঁর আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তাকে পিছনে ফেলে এক সময় স্বামীর সাথে বিদেশে চলে যান। কয়েক বছর পর আবার দেশে ফিরে আসেন তাঁর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে। দেশে এসে আবারও গানের জগতে মনোনিবেশ করেন। এক পর্যায়ে স্বামীর সাথে তাঁর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। পরবর্তি সময়ে একমাত্র ছেলেটাও বিদেশে চলে যায়। সে সময়টায়, লাখো-কোটি দর্শকশ্রোতার কাঙ্খিত কণ্ঠশিল্পী নার্গিস পারভীন একেবারেই একা হয়ে যান। জীবনভর যিনি, তাঁর বৈচিত্র্যময়-হৃদয়গ্রাহী সুরেলা কন্ঠের মূর্ছনায় মানুষের মন রাঙিয়েছেন, তাঁর নিজের জীবনের রঙ ফ্যাকাসে হয়েছে কখন, তা তিনি নিজেই বুঝতে পারেননি। সুখ-সুরের মূর্ছনায় রাঙাতে পারেননি নিজের জীবন। নব্বই দশকের শেষের দিকে তিনি গানের জগত থেকে একেবারেই দূরে সড়ে যান।

একাকি নিঃসঙ্গ জীবনে শরীরে বাসা বাঁধে মরণব্যধি ক্যানসার। মরণব্যধি ক্যানসারের সাথে লড়াই করতে করতে পরাজয় বরণ করে চিরবিদায় নেন ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৬০ বছর। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর গাওয়া গান বাংলা সঙ্গীতের আকাশে চিরকাল বেঁচে থাকবে।(সংগৃহীত)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category